Call us : 09032-56212

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৪তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের উদযাপন করা হয়েছে

Published: 2024-03-26

যথাযথ মর্যাদা ও কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৪তম স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের উদ্যাপন করা হয়েছে। এ উপলক্ষ্যে আলোক সজ্জা, প্রদীপ প্রজ্বালন, আলোচনা সভাসহ দুই দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শুরুতেই ২৫ মার্চ কাল রাত স্মরণে সোমবার (২৫ মার্চ) রাত ১১ টায় ক্যাম্পাসে বø্যাকআউট করা হয়। ফলে জাতীয় কর্মসূচির সাথে সংগতি রেখে এক মিনিট বিদ্যুতবিহীন গোটা ক্যাম্পাস অন্ধকারাচ্ছন্ন করা হয়।
এরপর রাত সোয়া ১১টায় প্রথমে ক্যাম্পাসের বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য ও পরে ‘চির উন্নত মম শির’ প্রাঙ্গণে প্রদীপ প্রজ্বালন করা হয়। মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. সৌমিত্র শেখর, ট্রেজারার প্রফেসর ড. আতাউর রহমান, রেজিস্ট্রার কৃষিবিদ ড. মো. হুমায়ুন কবীরসহ এসময় বিভিন্ন অনুষদের ডিনবৃন্দ, বিভাগ ও দপ্তর প্রধানগণ, শিক্ষক, ছাত্রছাত্রীসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রদীপ প্রজ্বালন শেষে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. সৌমিত্র শেখর। বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ কি সুন্দর একটা নাম। অথচ এই সুন্দর নামের আড়ালে ইতিহাসের জঘন্যতম কাজ পাকিস্তানিরা করেছিল। তারা অপারেশন সার্চ লাইট নাম দিয়ে নিরীহ বাঙালিদের গুলি করে হত্যা করেছিল হাজার হাজার মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলে, রাজারবাগ পুলিশ লাইন ঘুমন্ত মানুষের উপর তারা নির্বিচারে গুলি করে শত শত বাঙালিকে হত্যা করা শুরু করে দেয়। একাত্তরের ২৫ মার্চের রাত ইতিহাসে কাল রাত হিসেবে চিহ্নিত। এই রাতে যে গণহত্যা হয়েছিল তাকে হয়ত ইংরেজিতে ‘ম্যাস কিলিং’ বলা যেতে পারে কিন্তু তাতেও এই হত্যার নৃশংসতা বোঝানো যায় না। বরং এই নির্মমতাকে বোঝানোর জন্য ইংরেজিতে যে ‘জেনোসাইড’ শব্দটি আছে তার একটি ভালো বাংলা শব্দ আমাদের ভাবতে হবে।
২৫ মার্চ গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বিচারের জোরালো গণদাবি পুনরায় ব্যক্ত করে উপাচার্য ড. সৌমিত্র শেখর বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানীরা যে গণহত্যা করেছিল সে কাজটি ইতিহাসের জঘন্যতম কাজ। জঘন্যতম এই গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখনো আমরা পাইনি। আমরা দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই-এই গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিতে হবে। একই সঙ্গে এই গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। গণহত্যার সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের বিচার আন্তর্জাতিকভাবে করতে হবে। এটাই সময়ের গণদাবি।
দিবসটি উপলক্ষ্যে আজ মঙ্গলবার (২৬ মার্চ) সকালে প্রশাসনিক ভবনের সামনে জাতীয় সঙ্গীত সহযোগে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এরপর একটি বর্ণাঢ্য শোভা যাত্রা শুরু হয়। শোভাযাত্রাটি ক্যাম্পাসের সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্যে গিয়ে জমায়েত হয়। পরে শহিদদের স্মরণে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. সৌমিত্র শেখর পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর ড. আতাউর রহমান, রেজিস্ট্রার কৃষিবিদ ড. মো. হুমায়ুন কবীরসহ অন্যরা ধারাবাহিকভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান, দপ্তর প্রধান, হল প্রভোস্টগণ, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলসহ পেশাজীবি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে পায়রা অবমুক্ত করা হয়। এরপরে শোভাযাত্রাটি বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য থেকে ক্যাম্পাসের ‘চির উন্নত মম শির’ প্রাঙ্গণে গিয়ে জমায়েত হয়। এখানেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. সৌমিত্র শেখর পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। উপাচার্যের ট্রেজারার প্রফেসর ড. আতাউর রহমান, রেজিস্ট্রার কৃষিবিদ ড. মো. হুমায়ুন কবীরসহ অন্যরা ধারাবাহিকভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর প্রশাসনিক ভবনের কনফারেন্স কক্ষে দিবসটি উপলক্ষ্যে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. সৌমিত্র শেখর। বক্তব্যে মাননীয় উপাচার্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ১৫ আগস্ট নিহত বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য, বায়ান্ন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহিদ ও মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের স্মরণ করেন।
স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিক ইতিহাস তুলে ধরে উপাচার্য বলেন, স্বাধীনতা দিবস একটি দিবস মাত্র নয়। এই দিবসের সাথে আমাদের মুক্তির ও চেতনার ব্যাপারটি যুক্ত রয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুধু ১৯৭১ সালটির উপর নির্ভরশীল নয়। বাঙালির যে স্বাধীনতার স্পৃহা সেটি বহু বছর পুরোনো। বাঙালি যখন পরাধীন হয়ে যায়। একটি বৃহৎ পরিমন্ডলের অংশ হিসেবে বাঙালি যখন পরাধীনতার গøানি অনুভব করে তখন স্বাধীনতার জন্য আকুতি প্রকাশ করে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাঙালি ও এর আশেপাশের জনপদের যে পরাজয় হয়েছিল এরপর বাঙালির মধ্যে স্বাধীনতার আন্দোলন সংগ্রামের যাত্রা শুরু হয়েছিল তার সাথে একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। অর্থাৎ সেই যে বাঙালি স্বাধীনতা হারালো সেই স্বাধীনতাকে পুনরায় ছিনিয়ে আনার জন্য নানাদিকে আন্দোলন হয়েছে। বাঙালিরা করেছে, অবাঙালিদের মধ্যেও হয়েছে। কারণ তখন বাঙালিরা শুধু এই বাংলাদেশের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাই বাঙালির স্বাধীনতার স্পৃহার যে পর্ব সে পর্বকে ১৯০ বছরের একটি পর্ব হিসেবে প্রারম্ভিকভাবে চিন্তা করা যায়। সেটি ১৭৫৭-১৯৪৭। এই ১৯০ বছরের আন্দোলন সংগ্রামে আমাদের বাঙালিরা যেমন অংশগ্রহণ করেছে অবাঙালিরাও অংশগ্রহণ করেছে।
উপাচার্য আরও বলেন, আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুটো ঘটনা হলো বায়ান্ন সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও ৭১ সালের মহান মুক্তিসংগ্রাম। সেখানে দুটোক্ষেত্রেই বঙ্গবন্ধুকে কারান্তরালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানিরা মনে করেছিলÑব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে কারান্তরালে নিয়ে গেলেই হয়ত পুরো ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া যাবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কোনো ব্যক্তি নন তিনি ছিলেন একটি চেতনার জলন্ত প্রদীপ। দুটো সংগ্রামের ক্ষেত্রেই তার চেতনার দ্বারা তিনি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য তিনি ডেল্টা প্লান ঘোষণা করেছেন। আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার অভিযাত্রায় শামিল হয়েছে। আমাদের ঘোষিত শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নয়নের মটো ইতোমধ্যেই অনেকে অনুসরণ করছে। আসলে এই সার্বজনীন ¯েøাগনকে সাথে নিয়ে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় স্মার্ট ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে উঠবেÑস্বাধীনতা দিবসে এই হোক প্রত্যয়।
আয়োজক কমিটির সভাপতি প্রফেসর ড. মো. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন ট্রেজারার প্রফেসর ড. আতাউর রহমান, কলা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মুশাররাত শবনম, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো. রিয়াদ হাসান, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. উজ্জ্বল কুমার প্রধান, চারুকলা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. তপন কুমার সরকার। আলোচনা করেন শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. মো. শফিকুল ইসলাম, কর্মকর্তা পরিষদের সভাপতি মো. মোকারেরম হোসেন মাসুম, ডিরেক্ট অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফাহাদুজ্জামান মো. শিবলী, কর্মচারী সমিতি (গ্রেড ১১-১৬) সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম, কর্মচারী ইউনিয়ন ( গ্রেড ১৭-২০) সভাপতি রেজাউল করিম রানাসহ অন্যরা। স্বাগত বক্তব্য দেন রেজিস্ট্রার কৃষিবিদ ড. মো. হুমায়ুন কবীর, ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন আয়োজক কমিটির সদস্য-সচিব কল্যানাংশু নাহা। সঞ্চালনা করেন নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জান্নাতুল নাঈম ও সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাসুদুর রহমান। অনুষ্ঠান শেষে জাতীয় শিশুদিবসের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা ও স্বাধীনতা দিবসের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরষ্কার তুলে দেওয়া হয়।
আলোচনা সভা শেষে শেখ রাসেল কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অংশ গ্রহণ করেন।